আসসালামু আলাইকুম
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়—একটি সময় ছিল যখন দ্বীনি ইলম মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। সে সময় ইসলামি জ্ঞান ছিল উন্মুক্ত, সহজলভ্য ও কল্যাণমুখী। মানুষ ইলমে দীন অর্জন করত স্বাভাবিক জীবনপ্রবাহের অংশ হিসেবে।
কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ব্যস্ততা, সামাজিক পরিবর্তন, দারিদ্রতা, দূরত্ব, শ্রেণিভিত্তিক বিভাজন ও নানা সীমাবদ্ধতার কারণে আজ অনেকেই দ্বীনি শিক্ষার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারছেন না। ইলমে দীন থেকে দূরে সরে যাওয়ার পেছনে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ইচ্ছার অভাব নেই—বরং সুযোগ, ব্যবস্থা ও সহায়ক পরিবেশের অভাবই প্রধান কারণ।
এই বাস্তবতাকে গভীরভাবে উপলব্ধি করেই আমরা আল্লাহ তায়ালার উপর ভরসা করে “আমার মাদরাসা” নামক একটি অনলাইন কওমী মাদরাসার যাত্রা শুরু করেছি—যার লক্ষ্য হলো ইলমে দীনকে সহজ, উন্মুক্ত, ধারাবাহিক ও বাস্তবমুখী করে তোলা।
আমার মাদরাসা কী?
আমার মাদরাসা একটি অনলাইন ভিত্তিক কওমী ধারার দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এখানে কুরআন, তাজবিদ ও প্রাথমিক দ্বীনি শিক্ষাকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যেন শিক্ষার্থীরা ঘরে বসেই ধাপে ধাপে, বিশুদ্ধভাবে ও বোঝার মাধ্যমে শিখতে পারে।
এই প্রতিষ্ঠানটি কোনো বিকল্প ধর্মীয় ধারা নয়; বরং কওমী মাদরাসার পরীক্ষিত ও ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা পদ্ধতিকে আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় অনলাইনে সহজ করে উপস্থাপনের একটি বিনয়ী প্রচেষ্টা।
আমার মাদরাসা কেন?
বর্তমান সময়ে বহু শিক্ষার্থী—
- নিয়মিত মাদরাসায় যাওয়ার সুযোগ পায় না
- দূরত্ব, দারিদ্রতা, সময় ও পারিবারিক ব্যস্ততার কারণে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে না
- আবার অনেকেই দ্বীনি শিক্ষা শুরু করলেও মাঝপথে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়
এই বাস্তব সমস্যাগুলোর একটি কার্যকর ও বাস্তবসম্মত সমাধান হিসেবেই আমার মাদরাসা গড়ে তোলা হয়েছে—যেখানে স্থান ও সময় আর বাধা হয়ে দাঁড়ায় না।
আমার মাদরাসার স্বপ্ন
১. জ্ঞান একবার শোনা নয়, বারবার বোঝার সুযোগ সৃষ্টি
একজন শিক্ষার্থী তার শিক্ষা জীবনে অধিকাংশ পাঠ বা দরস সাধারণত একবারই শোনার সুযোগ পায়। ঐ সময়েই তাকে বিষয়গুলো মুখস্থ করতে হয়। কিন্তু পাঠটি যদি পূর্ণাঙ্গভাবে না বোঝে, তাহলে পরবর্তীতে সেটি আয়ত্ত করতে তাকে চরম কষ্ট পেতে হয়।
অনেক সময় অন্যের কাছে সাহায্য চাইতে গিয়ে শিক্ষার্থী হতাশ হয়।
- কেউ এক–দু’বার বুঝিয়ে দেয়,
- কেউ বিরক্ত হয়,
- কেউ আবার স্পষ্ট করে বলেই দেয় না—
যাকে আমরা মাদরাসার পরিভাষায় كتمان العلم (জ্ঞান গোপন করা) বলে থাকি।
আমার মাদরাসা এই জ্ঞান-গোপনের সংস্কৃতির অবসান ঘটাতে চায়। এখানে দরস রেকর্ডেড থাকে, শিক্ষার্থী ইচ্ছেমতো যতবার খুশি শুনতে পারে—যতক্ষণ না বিষয়টি তার কাছে স্পষ্ট হয়।
২. শিক্ষকভেদে সৃষ্ট শিক্ষা-গ্যাপ দূর করা
প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই সবল ও দুর্বল—উভয় মানের শিক্ষক থাকেন। ফলে প্রতি বছর কিছু কিতাব বা সাবজেক্ট শিক্ষার্থীদের কাছে দুর্বল থেকেই যায়।একজন মেধাবী শিক্ষার্থীও সেই দুই–একটি বিষয়ের কারণে আশানুরূপ ফলাফল করতে পারে না।
আমার মাদরাসা এই শিক্ষা-গ্যাপ দূর করার স্বপ্ন দেখে এবং ইনশাআল্লাহ এ জন্য কাজ করবে।
৩. অর্থ, স্থান ও মেধাগত সীমাবদ্ধতা ভেঙে দেওয়া
অনেক শিক্ষার্থী অর্থের অভাব, মেধাগত দুর্বলতা কিংবা পারিপার্শ্বিক সমস্যার কারণে গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চল বা শহরের ছোট প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।
আমার মাদরাসার লক্ষ্য হলো—
একজন শিক্ষার্থী যেন তার অবস্থানেই থেকে দেশের উন্নত মানের দরস শুনতে, দেখতে ও শিখতে পারে। অর্থের অভাব কিংবা মেধার দুর্বলতা যেন তাকে শিক্ষা থেকে হারিয়ে দিতে না পারে।
৪. সময় ও স্থানের সীমাবদ্ধতা থেকে শিক্ষাকে মুক্ত করা
বর্তমানে কুরআন ও ইলমে দীন শিখতে হলে নির্দিষ্ট সময়, নির্দিষ্ট স্থান ও নির্দিষ্ট ব্যক্তির উপর নির্ভর করতে হয়। এই সীমাবদ্ধতা বহু আগ্রহী মানুষকে দ্বীনি শিক্ষা থেকে দূরে সরিয়ে রাখে।
আমার মাদরাসা শিক্ষাকে সময় ও স্থানের গণ্ডি থেকে মুক্ত করে সবসময়, সবার জন্য উন্মুক্ত করার প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে চলছে।
৫. সামাজিক লাজ-লজ্জা ও শ্রেণিভিত্তিক দেয়াল ভাঙা
আমাদের সমাজে উঁচু ও নিচু শ্রেণীর একটি অদৃশ্য দেয়াল বিদ্যমান। অনেক শিক্ষিত ও সম্মানিত মানুষ লাজ-লজ্জার কারণে আলেমদের কাছে এসে কুরআন শেখা বা দ্বীনি বিষয়ে প্রশ্ন করতে সংকোচবোধ করেন।
আমার মাদরাসা এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে চায়— যেখানে মানুষ নিজের পরিচয় ও প্রাইভেসি গোপন রেখেই নিরবে ইলমে দীন অর্জন করতে পারে।
৬. একমুখী ও ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষাধারার স্বপ্ন
বর্তমানে বাংলাদেশে একাধিক ধারার শিক্ষাব্যবস্থা বিদ্যমান। আমার মাদরাসা এমন একটি একমুখী শিক্ষাধারার স্বপ্ন দেখে—
- যেখানে একদিকে প্রজ্ঞাবান আলেম তৈরি হবে,
- অন্যদিকে আধুনিক জ্ঞানেও পারদর্শী মানুষ গড়ে উঠবে,
- কিন্তু যার চরিত্র, আদব ও চিন্তায় হযরত মুহাম্মাদ ﷺ–এর আদর্শ স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হবে।
৭. জ্ঞানকে জীবনে বাস্তবায়নের অঙ্গীকার
আমার মাদরাসার লক্ষ্য কেবল পড়ানো নয়— বরং সেই শিক্ষাকে জীবনে বাস্তবায়ন করা।
যেন শিক্ষার্থীরা—
- আকীদা ও বিশ্বাসে
- ঈমান ও আমলে
- মুআ’মালা ও মুআ’শারাতে
- আদব ও আখলাকে
রাসূলুল্লাহ ﷺ–এর প্রকৃত অনুসারী হয়ে উঠতে পারে।
উপসংহার
আমার মাদরাসা কোনো সাধারণ শিক্ষা প্ল্যাটফর্ম নয়— এটি একটি দাওয়াতি প্রয়াস, একটি ইলমি আন্দোলন, এবং আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনের একটি বিনয়ী চেষ্টা। আল্লাহ তায়ালা যেন এই প্রচেষ্টাকে কবুল করেন, সহজ করে দেন এবং উম্মাহর জন্য কল্যাণময় করে তোলেন—আমীন।

