পিতা-মাতার প্রতি সদাচারণ: একটি উজ্জল দৃষ্টান্ত ও শিক্ষা।

সুপ্রিয় পাঠক!

এই লেখাটি “বিষ্ময়কর পুরস্কার” শিরোনামে মাসিক “আদর্শ নারী” পত্রিকাতে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। প্রায় ২ যুগ পূর্বে। আমার শিক্ষা জীবনের কোন এক সময়। বছর আর মাস কিছুই এখন মনে নেই। কিন্তু লেখাটি “ফোল্ডারে” সেভ করা ছিল। সেখান থেকেই আপনাদের সাথে শেয়ার করেছি। তবে লেখাটির সারাংশের প্রতি লক্ষ্য রেখে শিরোনাম পরিবর্তন করে দিয়েছি মাত্র।

আশা করছি- আপনি পাঠক উপকৃত হবেন ইনশাআল্লাহ।

পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ ও তার বিস্ময়কর পুরস্কার

হযরত সুলাইমান আলাইহিস্ সালাম। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের একজন বিশিষ্ট নবী। বহুকাল আগে তিনি পার্থিব এই দুনিয়াতে প্রেরিত হয়েছিলেন। আল্লাহ তায়ালার ইবাদতের পথে মানুষকে পরিচালিত করার মহান এক গুরু দায়িত্ব ছিল। মহান রব্বুল আলামীন তাকে মহা বিশ্বের রাজত্ব দান করেছিলেন। পৃথিবীর সব সৃষ্টিই তার হুকুম মেনে চলতো। সমুদ্রের মাছ পর্যন্ত তার কথার অমত হওয়ার কথা ভাবতে পারত না। 

তার রাজ্যের পরিধি ছিল পুরো বিশ্ব জুড়ে। কারো কোন অভিযোগ থাকলে তা শুনতেন। কারো কোন বিচার থাকলে তার ফায়সালা করতেন। কিন্তু এত পথ পাড়ি দিতে এবং মুহূর্তেই দিগন্ত থেকে দিগন্তে ছুটে চলার এক ঐশী শক্তির প্রয়োজন ছিল। তাই মহান আল্লাহ তায়ালার বিশেষ কুদরতে তিনি হাওয়াই সিংহাসনে চড়ে বেড়াতেন। আকাশে উড়ে উড়েই সমগ্র রাজ্য দেখাশোনা করতেন। জ্বীনের বিশাল শক্তিশালী বাহিনী সবসময়ই তার সাথে থাকত।

উত্তাল সমুদ্র মুহূর্তেই শান্ত হয়ে গেল

একদিন সুলাইমান আ. সিংহাসনে চড়ে গভীর এক সমুদ্রের উপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছিলেন। এমন সময় দেখলেন সমুদ্র উত্তাল। প্রচণ্ড বেগে বাতাস বইছে। তিনি সমুদ্রকে শান্ত হতে বললেন। মুহুর্তেই সমুদ্র শান্ত হয়ে গেল।

অতঃপর সুলাইমান আ. জ্বীনদেরকে বললেন- সমুদ্রে ডুব দিয়ে দেখ, কি হয়েছে তার। সে অশান্ত কেন। আদেশ পাওয়া মাত্র জীনেরা একের পর এক ডুব দিতে শুরু করল। এক সময় তারা সমুদ্রের গভীরে “উজ্জল মতির চতুর্বদ্ধদ্বার বিশিষ্ট একটি গম্বুজ” আবিস্কার করল।

সুলাইমান আ. তখন সিংহাসনে অপেক্ষমান। জ্বীনেরা সমুদ্র জলরাশি ছেড়ে উপরে উঠে এলো এবং সুলাইমান আ. কে তারা আশ্চর্যজনক সেই গম্বুজটির কথা জানাল। তিনি বললেন- যাও সেটা তুলে আন। যেই হুকুম সেই কাজ। তৎক্ষণাৎ তারা সেটি তুলে এনে সুলাইমান আ. এর সামনে রাখল।

তিনি ভ্রু কুচকালেন। ভাবলেন আল্লাহ তা‘য়ালার কী অসীম কুদরত! কোন অবলম্বন ছাড়াই তিনি গভীর সমুদ্রে এমন একটি গম্বুজ রেখে দিয়েছেন। কিন্তু এতে তিনি এমন কি রহস্য গোপন রেখেছেন! যার জন্য এটিকে এমন এক স্থানে রাখতে হল যা না যমিনে না আসমানে!?  তিনি আল্লাহ তা‘য়ালার দরবারে প্রার্থনা করলেন যেন তিনি এই গম্বুজের রহস্য উন্মোচন করে দেন।

দোয়া শেষ হতেই গম্বুজটি খুলে গেল। 

হযরত সুলাইমান আ. এর দু‘আ শেষ হতেই গম্বুজটি একদিকে ফাক হয়ে গেল। সেখানে বেড়িয়ে এলো ভেতরে প্রবেশের একটি দরজা। দেখতে পেলেন একজন যুবক সেখানে মহান আল্লাহর তা‘য়ালার দরবারে সেজদায় পড়ে আছেন। অবাক নয়নে সুলাইমান আ. কিছুক্ষণ তার প্রতি তাকিয়ে রইলেন। কিন্তু পরক্ষণেই তাকে মৃদুকন্ঠে ডেকে উঠলেন। জিজ্ঞেস করলেন-

: জাতিতে তুমি ফেরেশতা না জ্বীন?

: না, না আমি ফেরেশতাও নই জ্বীনও নই। বরং আমি একজন সাধারণ মানুষ। 

এতে সুলাইমান আ. এর বিস্ময়ভাব আরো বেড়ে গেল। সমুদ্রের গভীরে মানুষ! তাও আবার এমন সুরক্ষিত অবস্থায়। এটা কেমন করে হতে পারে। কি পূণ্য করলে মানুষ এমন সম্মান পেতে পারে। তিনি চিন্তিত হয়ে পড়লেন। পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন-

: আচ্ছা তুমি একজন সাধারণ মানুষ হয়েও এই অসাধারণ সম্মান কী করে লাভ করলে?

: পিতা মাতার প্রতি আমার সদাচারণই আমাকে এই মহা সম্মান দান করেছে।

আমার মাতা বৃদ্ধা ছিলেন।তিনি চলাফেরা করতে পারতেন না। আমি তাকে পিঠে নিয়ে সবসময় চলাফেরা করতাম। তিনি আমার জন্য সবসময় দোয়া করতেন। বলতেন- আয় আল্লাহ! আমাকে আমার ছেলে যেমন রাখল তুমিও তাকে তেমন রেখো। আসমানেও রেখো না আবার যমিনেও রেখো না।

একসময় তিনি ইন্তেকাল করলেন। মনের মত ভালো একটি জায়গা দেখে তাকে দাফন করলাম।

মায়ের ইন্তেকালের পরই আমি এই বিষ্ময়কর পুরষ্কার পেলাম।

সমুদ্র সৈকত ছিল আমার একটি প্রিয় স্থান। একদিন আমি সৈকতে ঘুরছি। হাঁটতে হাঁটতে একসময় হঠাৎ দেখতে পেলাম উজ্জল মতির একটি বদ্ধ গম্বুজ। চোখে মুখে বিস্ময় ফুটে উঠল। ভাবলাম সাগর পাড়ে এমন গম্বুজ কী করে সম্ভব! ধীরে ধীরে আমি তার কাছে গেলাম। গম্বুজটি নিঃশব্দে খুলে গেল।

গম্বুজের ভেতরটা ছিল চোখ জুড়ানো কারুকাযে পূর্ণ। মুহূর্তেই আমি তার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে পড়লাম। কৌতুহল বশতঃ একসময় তাতে ঢুকে পরলাম। প্রবেশ করা মাত্রই গম্বুজটি বন্ধ হয়ে গেল। আমার আর সেখান থেকে বের হতে ইচ্ছে করল না। মায়ের দোয়ার কথা মনে হলো। বুঝলাম এ আমার “জনম দুঃখিনী” মায়ের মকবূল দোয়ার ফসল।

মহান আল্লাহ তা‘য়ালার মহা অনুগ্রহ। এখানেই তিনি আমার জন্য ভালো ভালো খাবারের ব্যবস্থা করে দিলেন। সেই থেকে আজ অবধি এখানেই খুব সুখে আছি।

হযরত সুলাইমান আ. বিস্ময়ে অভিভূত

সুলাইমান আ. বিস্ময়াভিভূত। তিনি পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন-

: তোমার খাবার আসে কীভাবে?

: যখন আমি ক্ষধার্ত হই তখন মতির এই দেয়াল থেকে একটি বৃক্ষ বেরিয়ে আসে। সেখান থেকে তৎক্ষণাৎ ফল উৎপন্ন হয়। অপরদিকে গম্বুজ থেকে নির্গত হয় এমন পানীয়। যা দুধের চেয়ে সাদা, মধুর চেয়ে মিষ্টি এবং বরফ থেকেও বেশী ঠাণ্ডা। আমি তা আহার করি এবং পান করি। যখন পরিতৃপ্ত হই তখন সেগুলো অদৃশ্য হয়ে যায়।

সুলাইমান আ. তার বর্ণনায় বিমোহিত হলেন। এবার তিনি তাকে শেষ প্রশ্ন করলেন-

: তুমি এর মাঝে রাত দিনের তারতম্য বুঝতে পারো? আর নামাজেই বা পড়ো কিভাবে?

: যখন সূর্যোদয় হয় তখন ভিতরটা আলোয় আলোয় ভরে উঠে। আর যখন সূর্যাস্ত হয় তখন তা অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। আমি দুনিয়ার মতো এখানেও স্বাভাবিকভাবে ইবাদত করতে পারি। এতে আমার কোন সমস্যা হয় না।

আফসোস, যদি মানুষ পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ করত!

সুলাইমান আ. আশ্চার্যান্বিত হলেন। তিনি মনে মনে বললেন- আফসোস! মানুষ যদি জানতো পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ তাকে সৌভাগ্যের কোন স্তরে উন্নীত করতে পারে। তবে কেউই তার পিতা-মাতার সামান্যতমও অবাধ্য হতো না।

এসব ভাবতে ভাবতে এক সময় মহান আল্লাহ তা‘য়ালার কুদরতের এই পুরষ্কার দেখে তার শুকরিয়ায় নিজের হৃদয়কে সিক্ত করলেন। দোয়া করলেন হে আল্লাহ! এই গম্বুজটি আপনি তার সস্থানে ফিরিয়ে নিন। আমার হৃদয় প্রশান্ত হয়ে গিয়েছে। হে বিশ্ব জাহানের প্রতিপালক, সকল প্রশংসা ও শুকরিয়া কেবল আপনার জন্যই। 

গম্বুজটি তার সস্থানে ফিরে গেল।

Related Articles

পূর্ববর্তী ইমামগণের মতভিন্নতায় বিভেদ ছিল, বিচ্ছিন্নতা নয়!

সুপ্রিয় পাঠক! সামান্য মত পার্থর্ক্যরে জের ধরে সাধারণ সমাজের কথা বলা তো বাহুল্যই, আমাদের ওলামা কেরামের মাঝেও যে কী ধরনের গিবত-পরনিন্দা, বকাবাজি আর গালবাজি দেখা…

কল্যাণমুখী মতভিন্নতা যেভাবে বিচ্ছেদ ও বিরোধিতায় রূপ নিল।

এটি আর্টিকেলের ২য় অংশ। প্রথম অংশটি পড়তে এখানে ক্লিক করুন।  যখন আমি লেখাটি অনুবাদ করি তখন আমি “জালালাইন জামাতের” একজন সাধারণ ছাত্র। নিজেকে ও নিজের…

চরমোনাই পীর সৈয়দ ফজলুল করীম রহ. এর জীবনের শেষ মুহূর্তগুলো।

সুপ্রিয় পাঠক! ২৬ নভেম্বর ২০০৬ সাল। আমি বন্ধুদের সাথে মরহুম চরমোনাই পীর সাহেব সৈয়দ ফজলুল করীম রহ. এর জানাযায় উপস্থিত হতে পেরেছিলাম। জানাযা শুরুর পূর্বে…

ফার্সি ক্রিয়াপদ বা صيغه গঠন পদ্ধতি। এক পেজেই শুরু থেকে শেষ।

বিষয়ঃ فعل ماضي বা অতীত কাল প্রশ্নঃ فعل ماضي বা অতীতকালের ক্রিয়া কাকে বলে? উত্তরঃ فعل এর যে রূপ দ্বারা অতীতকালে কোন কাজ হয়েছে বা…